
চার
পরের দিন সাড়ে ১২টার সময় দরজায় প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভাঙল । তাড়াহুরো করে উঠে দরজা খুলে দেখলাম বদরুল দাঁড়িয়ে আছে ওর পাশেই দাড়িয়ে আছেন পরিচালক এ'তে শামস্ সাহেব। হঠাৎ তাকে এখানে দেখে আমি বেশ অবাক হলাম ।
আমার মেসে এ'তে শামস্ এর মতো পরিচালক আসবে এতোটা আশা করিনি । আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললাম," স্যার আপনি ?"
- দেখো দেখি তোমাকে না জানিয়েই চলে আসলাম । এসে শুনি তোমার মেসের মালিক মারা গেছেন । চলে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু আজ ই আমাকে আবার ব্যাংক চলে যেতে হচ্ছে । তাই ভাবলাম, এসেছি যখন দেখাটা করেই যাই । তুমি দেখছি বিধ্বস্ত হয়ে আছে । যদি একটু সময় দিতে, তা হলে কয়েকটা কথা সেড়ে নিতাম । অবশ্য এখানে দাড়িয়েও বলতে পারি ।কথাটা বলে তিনি বদরুলের দিকে তাকালেন ।
আমি অস্থির হয়ে বললাম , আপনি ভেতরে আসুন স্যার । স'দু ভাই , মানে যিনি মারা গেছেন তিনি আপনার অনেক বড় ফ্যান ছিলেন । আপনার দূর দেশে ছবিটা উনি ১০০ বারের উপর দেখেছেন । আপনি এখানে এসেছেন উনি বেচে থাকলে যারপর নাই খুশি হতেন ।
আপনি ভেতরে এসে বসুন । আমি এক মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নিচ্ছি । আমি দরজা থেকে সড়ে দাঁড়ালাম ।
এই প্রথম রুমের ভেতরের অবস্থা দেখে নিজের কাছে লজ্জা লাগল । এ'তে শামস্ সাহেব চারিদিকে একবার নজর বুলিয়ে টেবিলের সামনে থেকে একটা চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পরলেন ।
আমি বললাম, স্যার যদি কিছু মনে না করেন ; আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি । তিনি মাথা নেড়ে বললেন, সিওর । তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, তোমার এখানে আসট্রে নেই ? সিগারেট ছাড়া আমি আবার একদম থাকতে পারি না।
আমি খাটের নীচ থেকে একটা ভাঙা চায়ের কাপ অনিচ্ছা সত্যেও বের করে টেবিলের উপর রাখলাম । কাপটা দেখে তিনি হেসে সিগারেট ধরালেন ।
আমি বদরুলকে চা দেবার কথা বলে বাথরুমে ঢুকে গেলাম ।
এ'তে শামস্ সাহেব আমাকে দু’লাখ টাকার একটা ক্যাশ চেক দিয়ে একটা কাগজে সাইন করিয়ে নিলেন । কথা হলো উনি আমার চিত্রনাট্যটি নিয়ে কাজ করবেন । শুটিং শুরু হবে মাস দু’য়েকের মধ্যেই । তখন আরো তিন লাখ পেমেন্ট করবেন ।জীবনের প্রথম সাফল্যে আমি থরথর করে কাঁপতে লাগলাম । উত্তেজনায় কাগজটার মধ্যে কি লেখা আছে সেটা ভাল করে না পড়তেই সাইন করে চেকটা হাতে নিলাম ।
হঠাৎ সদু ভাইয়ের জন্য ভেতরটা হু হু করে কেঁদে উঠল । আহা! মানুষটা বেঁচে থাকলে আজ সব চাইতে বেশি খুশি হতেন । অথচ আমার সাফল্যে তিনি দেখে যেতে পারলেন না ।
সন্ধ্যার পর স'দু ভাইকে বংশাল কবরস্থানে দাফন করা হলো । মানুষটা যে কতো জনপ্রিয় ছিলো তা তার জানাজায় উপস্থিত লোক সংখ্যা দেখে বুঝা গেলো । মেসের ১০০ জন বোর্ডার ছাড়াও পুরো এলাকাবাসী উপস্থিত হলো মসজিদ ও কবরস্থানে ।
সদু ভাইয়ের মৃত্যুর পর পুরো মেসটা যেন অতিরিক্ত নীরব হয়ে গেছে । দোতালার বেশ কয়েকজন বর্ডার পুলিশের অনুমতি নিয়ে মেস ছেড়ে চলে গেছে ।
কথায় আছে, গুজব ছাড়াতে দশ কান লাগে না এক কানে পৌছে দিলেই সেটা নাকি নিজ থেকে দশ কানে পৌছে যায় । মধুমিতা মেস নিয়ে ও তেমন একটা গুজব মহল্লা ছাড়িয়ে পুরো দেশে জড়িয়ে পরলো ।
স'দু ভাইয়ের কুলখানির পর অনেকেই বলাবলি করতে লাগলো স'দু ভাইকে নাকি রাতের বেলা মেসের বারান্দা দিয়ে খুরিয়ে খুরিয়ে হাঁটতে দেখা গেছে ।
এ কান ওকান হয়ে কথাটা যখন আমার কানে এসে পৌছলে আমি সেটাকে মোটেও গুরুত্ব দিলাম না । বেঁচে থাকতে যে মানুষটাকে বুক ফুলিয়ে হাঁটতে দেখেছি, মরে গিয়ে সে কিনা খুরিয়ে খুরিয়ে হাঁটবে ?
পুরোটাই মিথ্যা বোগাস ছাড়া আর কিছু না । স'দু ভাইকে নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে সব চাইতে বেশি মিথ্যা ছড়াচ্ছে কাজের বুয়া রেহানার মা ।
রহিমার মা স'দু ভাইকে নিয়ে ভয়ংকর ভয়ংকর সব গল্প ফেঁদে বসেছে । একদিন সকালে এসে বললো , সে আর রাতের খাবার রান্না করতে পারবে না । কারণ সু'দু ভাইকে সে নাকি রান্না ঘরে দেখেছে ।দু'পুরের খাবারের পর সে যখন কল তলায় থালা বাসন ধুচ্ছিল, তখন নাকি রান্না ঘরে খটর মটর শব্দ শুনে রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে, সদু ভাই খালি গায়ে চুলার কাছে কি যেন খুঁজছে । বুয়া দরজায় দাড়াতেই, সদু ভাই নাকি তার কি তাকিয়ে বলে উঠেছেন, ও রেহানার মা ম্যাচটা কোথায় রেখেছো ? ম্যাচটা দাও, একটা সিগারেট খামু । আমি ধমক দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলেও -
রহিমার মার এ গল্পটাই সব চাইতে বেশি ছড়িয়ে পরেছে ।
আশে পাশের দশ বাড়িতেও এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে । আমি এসব কথাবার্তাকে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছি না। কারো সঙ্গে এ প্রসঙ্গে আলোচনাও করছি না । বার দুয়েক বদরুল এসেছিল আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছে । আমি পাত্তা দেয়নি । কথার শুরুতেই ওকে থামিয়ে দিয়ে বলেছি, বদরুল বাজে বিষয় নিয়ে কথা বলে আমার সময় নষ্ট করবে না । যাও নিজের কাজ করো গিয়ে ।
বদরুল আর কিছু বলার সাহস পায়নি মাথা নিচু করে চলে গেছে । যতোসব বাকোয়াস কথাবার্তা । আমি পূর্ণ উদোমে লেখা লেখি চালিয়ে যাচ্ছি । ইতিমধ্যে একটি পত্রিকায় আমার ছোটখাটো ইন্টার্ভিউও ছাপা হয়েছে ।
অন্যান্য কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে বিদ্যুতের গতিতে নতুন চিত্রনাট্য লিখে চলেছি । পরপর দু’টো ফিকুয়েন্সের কাজ শেষ করে ফেলেছি । ঝামেলা বাঁধল তৃতীয়টার সময় ।
সদু ভাইকে মেসে দেখার ঘটনাগুলো আমি গুরুত্ব না দিলেও আমার অজান্তেই মেসের ভেতর একটা কিছু ঘটে যাচ্ছিল তার প্রমাণ পেলাম আরো দু’দিন পর । আমার পাশের রুমে থাকেন ব্যাংক কর্মকর্তা ওমর ফারুক সাহেব। সাদাসিধে মাঝারি আকৃতির অমায়িক লোক । কারো আগে পিছে নেই । তিনি কিনা রাতের বেলায় কি দেখে ভয় পেয়ে হার্ট এ্যটাক করে বসলেন। মেসের সবাই ছোটাছুটি করে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করালো ।
ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার খুব একটা কথাবার্তা না হলেও একদিন কি মনে করে যেনো আমি তাকে হাসপাতালে দেখতে গেলাম ।
ইদানীং বাংলাদেশের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর চেহারা বদলে গেছে । ঝকঝকে তকতকে হাসপাতাল দেখে মন ভাল হয়ে যায়। ওমর ফারুক সাহেব আছেন হাসপাতালের দোতালার একটি কেবিনে । আমি তার কাছে পৌঁছে দেখি তিনি আঙুর খাচ্ছেন । দশ বারো বছরের একটি মেয়ে তার মুখে একটা একটা করে আঙুর তুলে দিচ্ছে আর উনি মজা করে তা খাচ্ছেন। হঠাৎ আমি উপস্থিত হওয়ায় আমাকে দেখে ফুরুক সাহেব একটু লজ্জা পেলেও হেসে বললেন, আসেন লেখক সাহেব ।
আমি হেসে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেসা করলাম, তা এখন কেমন আছেন ?
জ্বি ভাল । ফারুক সাহেবকে দেখে মনে হলো তিনি আবার লজ্জা পেলেন ।
কিছু মানুষ আছে, লজ্জা বতি লতার মতো তারা সব কিছুতেই একটু বেশি লজ্জা পান । ফারুক সাহেব ও তেমন একজন মানুষ । আমি তাকে অকারণ লজ্জার হাত থেকে বাচাতে চেয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম, ও কি আপনার মেয়ে নাকি ? আমি মেয়েটার মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞাসা করলাম ।
জ্বি । দেখুনতো কতো করে বলছি হাসপাতালে ছোটদের আসার দরকার নেই কিন্তু তবুও নাছোড়বান্দা আমাকে নাকি দেখতেই হবে । প্রতিদিন হাসপাতালে আসছে ।
মেয়েটার গায়ের রং হালকা শ্যামলা । কাধ পর্যন্ত কোকড়ানো ঝাকড়া চুল ।
আমি মেয়েটাকে কাছে টেনে জিজ্ঞাসা করলাম, কি নাম তোমার মা মনি ?
মেয়েটা ছোট করে বলল, মায়া ।
বাঃ সুন্দর নাম তো।
তুমি কোন ক্লাসে পড় তুমি ?
এক ঝাক ফোকলা দাত বের করে সে বলল, ক্লাস থ্রি'তে।
ও তাই নাকি ? আমিও তো থ্রি তে পড়ি । যাক তুমি আর আমি একই ক্লাসে পড়ি । কথাটা বলে আমি হাসলাম। মেয়টি কিন্ত হাসলো না । সে ফোকলা দাতে টুকটুক করে বলল, তুমি মিথ্যা বলছো । তুমি তো বড় । তুমি আব্বুর লেখক বন্ধু । আব্বুর সঙ্গে মেসে থাকো । আমি সব জানি ।
ওমা তাই নাকি ? তুমি তো দেখছি তোমার আব্বুর বুড়ি মা ।
আমি বুড়ি না, আমার বয়স তো মাত্র এগারো বছর ।
এমন সময় ফারুক সাহেবের স্ত্রী রুমে ঢুকলেন । আমাকে দেখে সালাম দিলেন । আমিও সালাম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম , ভাবি ভাল আছেন ? তিনি উত্তর দিয়ে ফারুক সাহেবের সাথে কয়েকটা কথা বলে মেয়েকে নিয়ে বাহীরে চলে গেলেন ।
আমি আরো কিছুক্ষন ফারুক সাহেবের সাথে নানা বিষয়ে গল্প গুজব করলাম। রাজনীতি, শেয়ার বাজার, সঞ্চয় পত্রের সুদ ইত্যাদি নানা বিষয়ের আলোচনার ফাকে একসময় ফারুক সাহেব আমাকে বললেন, ভাই আমি আর ঐ মেসে যাবো না । একটু সুস্থ হলে জিনিষ পত্র সব নিয়ে আসবো ।
আমি অবাক প্রশ্ন করলাম, সেকি কেন ?
- মেসটার দোষ হয়েছে । ওখানে খারাপ আত্মা বাসা বেঁধেছে ।
আমি বলতে যাচ্ছিলাম এসব বাজে কথা। কিন্তু কিছু বলার আগেই ওমর ফারুক সাহেব আবার বলে উঠলেন, আমি জানি আপনি এসব বিশ্বাস করেন না । তবুও বলছি, সম্ভব হলে আপনিও মেসটা ছেড়ে দিন । আমি প্রসঙ্গ বদলাবার জন্য বললাম , আপনি ভয় পেলেন কি দেখে ?
ফারুক সাহের হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে একটু ঘাবড়ে গেলেন,। তারপর আমতা আমতা করে বললেন, বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না ।
আমি বললাম , না,বিশ্বাস করবো, আপনি বলেন ।
ওমর ফারুক সাহেব একটু ঝুকে এসে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন, স'দু ভাইকে দেখে ।
সদু ভাইকে ? আমি কপাল কুচকে ফেললাম ।
জি,হ্যা স'দু ভাইকে দেখে । সেদিন রাতে বাথরুমে যাবার জন্য দরজা খুলে বারান্দায় বের হয়ে দেখি সদু ভাইয়ের রুমের দরজা খোলা । আলো জ্বলছে । এতরাতে স'দু ভাইয়ের রুমে কে, তা দেখার জন্য আমি এগিয়ে গেলাম ।
দরজার দাঁড়িয়ে ভেতরে উকি দিতেই দেখি; স'দু ভাই হাতে একটা মোটা দড়ি নিয়ে ফ্যানের নিচে চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে দড়িটা ফ্যানে বাঁধার চেষ্টা করছেন।
আমি, কে ? বলার সঙ্গে সঙ্গে সদু ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “ও ব্যাংকার এদিকে এসে চেয়ারটা একটু শক্ত করে ধরো তো দেখি । মনে হচ্ছে পইড়া যামু ।”
এ কথা শুনার পর আমার আর কিছু মনে নেই । সঙ্গে সঙ্গে বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করি । তারপর বুক চেপে ধরে পরে গেলাম। চোখ খুলে দেখি আমি হাসপাতালে ।
ওমর ফারুক সাহেবের কথা ফেলে দিতে পারলাম না । একেবারে মনের মধ্যে গেঁথে গেল । ভয় হচ্ছে সংক্রামক ব্যাধির মতো একবার কারো ভেতর ঢুকে গেলে ডাল পালা ছড়াতে শুরু করে । নানান যুক্তি দিয়েও তখন তাকে আর বশ মানানো যায় না । একরাশ এলোমেলো চিন্তা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মেসে ফিরলাম রাত ১১টার।
চলবে ................
