একটা রাজ্য ছিলো। সে রাজ্যে ছিলো অনেকগুলো নগর। তারমধ্যে ভূসাম একটা। ভূসামে চাষাবাদ উপযোগী জমি ছিলো না। অর্থনীতির উৎস ছিলো বিভিন্ন ব্যবসাবাণিজ্য। ভূসামের লোকজন আশেপাশের বিভিন্ন নগরগুলোতে ব্যবসা করেই আয়রোজগার করতো। বাণিজ্যকেন্দ্রিক ও খাদ্যের জন্য পরনির্ভরশীলতা ভূসাম নগরীকে সবসময় পিছু টেনে ধরতো। নগরের মানুষগুলোর সংসারে টানাপোড়ন লেগে থাকতো সবসময়। অথচ রাজ্যের অনেক নগরই ছিলো ভূসামের বিপরীত। সেগুলোতে চাষাবাদের জন্য উর্বর জমি ছিলো। প্রতি মৌসুমে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফসল হতো। উদ্বৃত্ত ফসল বিক্রি করে বেশ আয়-উপার্জন হতো। বলতে গেলে বেশ সুখেই জীবনযাপন করতো সে নগরগুলোর মানুষজন।


একদিন ভূসামের নগরপ্রধান চিন্তা করলেন, এভাবে আর দিন কাটানো সম্ভব নয়। নগরের আয়-উন্নতির ও খাদ্য নিশ্চয়তার জন্য শুধু এই ব্যবসা-বাণিজ্যে নির্ভর থাকা যায় না। কিন্তু কী করা যায় সেটা চিন্তায় কুলোতে না পেরে নগরসভার আহ্বান করলো। সভায় ডাক পড়লো ভূসামের সকল জ্ঞানী-গুণী বুদ্ধিমান ব্যক্তিবর্গের। আলোচনায় অনেকে অনেক মতামত দিলো, পরামর্শ দিলো। একজন বললো আমাদের এমন এক ব্যবসা শুরু করতে হবে যেটা একচেটিয়াভাবে আমাদের দখলে থাকবে। কিন্তু কি সেই ব্যবসা, কেউ বলতে পারলো না। আরেকজন বললো, আমরা যদি পাশের নগরকে দখল করে নিই, তাহলে বেশ সুবিধা হবে আমাদের জন্য। কিন্তু এই সভ্যযুগে নগর দখল রাজ্যবিরোধী। তাই এটা সম্ভব না। এভাবে একেকজন একেক পরামর্শ দিলো কিন্তু কার্যকরি কোনো উপায় কেউ বলতে পারলো না। তাই সেদিনের মত নগরসভা সমাপ্ত হলো।


নগরপ্রধান খুব চিন্তিত। এভাবে তো চলতে পারে না। খাদ্যসংকট, অর্থনৈতিক মন্দা, এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই এ নগরের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। নগরপ্রধানের এত দুশ্চিন্তা দেখে তার স্ত্রী বললো, "ইবলুম মন্দিরে যাও। সেখানে গিয়ে মন্দিরের পুরোহিতদের কাছে সাহায্য চাও। নিশ্চয় তারা একটা সমাধান দিবে।"


ইবলুম মন্দির মূলত নগরের সীমানার বাইরে এক গহীন জঙ্গলে অবস্থিত। একসময় মন্দিরটি এ গাঁয়ের প্রাণকেন্দ্রেই ছিলো। কিন্তু ঈশ্বরের পরিবর্তে শয়তানের পূজা করায় নগরের মানুষদের তোপে পুরোহিতসহ মন্দিরটাকে নগরের সীমানার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই মন্দিরের পুরোহিতরা বেজায় দুষ্ট প্রকৃতির। অন্যের ক্ষতিসাধনের তারা ছিলো অসম্ভব পটু। ইবলুমের সাহায্য নেয়া মানে ঈশ্বরকে ত্যাগ করে শয়তান পূজারীর সাথে চুক্তি করা। এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে নগরপ্রধান অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেল - ইবলুমের সাহায্য নেয়া ঠিক হবে কিনা। কিন্তু স্ত্রী ভরসা দিলো - নগরের সকলের কল্যাণের জন্য ইবলুমের সাথে সমঝোতা অন্যায় কিছু নয়। শেষতক রাজি হয়ে মন্দিরের পুরোহিতদের সাথে নগরপ্রধান বিস্তারিত আলোচনা করলো। সভায় উত্থাপিত সকল পরামর্শও বর্ণনা করলো। মন্দিরের পুরোহিতরা সব শুনে নগরপ্রধানকে বললো আমরা সমাধান দিবো কিন্তু আমাদের তিনটা শর্ত আছে যেগুলো পূরণ করতে হবে। প্রথম শর্ত হচ্ছে, ইবলুম মন্দিরকে পুনরায় নগরের প্রাণকেন্দ্রে স্থাপন করতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত, নগরসভার স্থায়ী উপদেষ্টা হিসেবে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত থাকবেন। আর তৃতীয় শর্ত, মন্দির ও পুরোহিতদের সকল ব্যয়ভারের ভরণপোষণ ঐ নগরের উপার্জিত রাজস্ব থেকে বহন করতে হবে। দাবিগুলো শুনে নগরপ্রধান ধীরস্থির হয়ে পুরোহিতদের বললেন আমাকে আগে আমার সভামন্ডলীদের সাথে আলোচনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারপর জানাবো - এই বলে নগরপ্রধান চলে আসলো।

পরদিন সভায় উপস্থিত সকলে বিস্তারিত শুনে পুরোহিতদের দাবি মেনে নিতে রাজি হলো। তাই পুনরায় নগরপ্রধান পুরোহিতদের সাথে দেখা করলো।


পুরোহিতরা তাকে পরামর্শ দিলো, "তোমরা উন্নত যুদ্ধ সরঞ্জামাদির কারখানা তৈরি করো আর সেটার ব্যবসা পাশের নগরগুলোতে চালিয়ে যাও।"


এ কথা শুনে নগরপ্রধান অবাক হয়ে বললো, "এগুলো তো বিক্রিই হবে না। কারণ নগরগুলোর কোথাও যুদ্ধ নেই। আর সেই যুদ্ধের যুগও নেই, যখন যুদ্ধ করে নগর দখল করে নেয়া যেত। সর্বত্রই এখন সভ্য ও শান্ত পরিবেশ।"


পুরোহিত জবাবে বললো, "যুদ্ধ নেই তো কী হয়েছে, যুদ্ধের সৃষ্টি করবে, যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিবে। যুদ্ধের সরঞ্জামাদি কেনার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করবে।"


নগরপ্রধান তবুও খুশি হতে পারলো না। জিজ্ঞেস করলো, "বুঝলাম কিন্তু কিভাবে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিবো?"


এসময় প্রধান পুরোহিত বললো, "আমরা বিভিন্ন গ্রন্থে জানতে পেরেছি এ রাজ্যে এমন অনেক নগর রয়েছে যেখানে রাসা জাতিদের বাস। তারা ধর্মীয় ও জাতিগতভাবে বেশ যোদ্ধাপ্রকৃতির। তাদের ইতিহাস তাই বলে। যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা অনেক আগেই যুদ্ধ ছেড়ে দিয়েছে। একটা সময় ছিলো তারা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং এই প্রতিবাদী যোদ্ধাচরিত্র এখনও তাদের রক্তে মিশে আছে। তোমাদের কাজ হবে তাদের সেই যুদ্ধবৃত্তিকে পুনরায় জাগিয়ে তোলা। তার আগে তোমার নগরের বাছাই করা জওয়ানদের নিয়ে সৈন্যবাহিনী তৈরি করো, তাদের প্রশিক্ষণ দাও। পাশাপাশি তোমাদের নগর থেকে জ্ঞানী পন্ডিতদের বাছাই করে তাদেরকে রাসাধর্মের ধর্মীয় পন্ডিত করে তোলো এবং বুদ্ধিমানদের দিয়ে একটা গুপ্তচর গোষ্ঠী প্রশিক্ষিত করো, যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক-কূটকৌশলবিদ্যায় পারদর্শী হবে। আর তোমাদের কারখানাগুলোতে যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করো। অস্ত্র তৈরি করতে হবে দুই ধরণের। একটা অতিউন্নত ও শক্তিশালী যেটা কেবলমাত্র তোমাদের নিকট গোপন থাকবে। আরেক ধরণের হলো অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী। এগুলো তোমরা বিক্রি করবে। এগুলো সমাপ্ত হলে পুনরায় ইবলুম মন্দিরে আসবে। তখন জানিয়ো দিবো কিভাবে পরের ধাপের কাজগুলো করতে হবে। "


নগরপ্রধান পুরোহিতের সকল পরামর্শ অনুযায়ী সভাসদদের নিয়ে গোপনে যুদ্ধাস্ত্র, সৈন্য, ধর্মগুরু ও গুপ্তচর তৈরিতে লেগে গেলো। কিন্তু রাজ্যের নগরগুলো কেউ জানলো না। এভাবে বেশ কয়েকমাস কেটে গেলো। সব প্রস্তুতশেষে ইবলুম মন্দিরে রাজপ্রধান পুরোহিতদের সাথে দেখা করতে গেলো।


পুরোহিতরা এবার পরামর্শ দিলো, "সর্বপ্রথম ধর্মগুরু ও ছদ্মবেশী গুপ্তচরদের পাশের নির্ধারিত নগরগুলোতে পাঠাতে হবে। গুপ্তচরদের দায়িত্ব হচ্ছে, বিভিন্ন নগরীর গোত্রে গোত্রে বিভেদ সৃষ্টি করবে, জাতপাতের ভিত্তিতে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিবে। আর নগরপ্রধানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী দাড় করিয়ে নগরবিদ্রোহ সৃষ্টি করবে। এর পাশাপাশি প্রশিক্ষিত ধর্মগুরুরা প্রথমে তাদের ধর্মানুরাগীদের প্রভাবিত করে তাদের বশে নিয়ে আসবে। তাদের উপাসনালয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণে নিবে। ধীরে ধীরে ধর্মীয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের ধর্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করবে। কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট অস্থিতিশীল ও দুর্নীতিগ্রস্থ ঐ নগরগুলো যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছুবে তখন তাদের মধ্য থেকে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদী শ্রেণি সৃষ্টি হবে। ধর্মগুরুদের কাজ হচ্ছে সেই সংঘবদ্ধ প্রতিবাদী শ্রেণিটাকে ধর্মীয়ভাবে তাদের যুদ্ধবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলা। তারপর তাদের কাছে কিছু অস্ত্র সরবরাহ করা। যাতে তারা দুর্নীতিগ্রস্থ তাদের নগরশাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে। নগরশাসকদের পুরনো যুদ্ধাস্ত্রগুলো নিয়ে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে পেরে উঠবে না। আর তখনই তোমরা তাদের সাথে অস্ত্রবিক্রির চুক্তিতে যাবে। এভাবেই শুরু হবে তোমাদের যুদ্ধাস্ত্র ব্যবসা।"


পুরোহিতের কথা শুনে নগরপ্রধানের চোখ খুশিতে ঝলমল করে উঠলো। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইবলুম মন্দির ও পুরোহিতদের ভূসামে নিয়ে আসা হলো। তাদের সকল ব্যয়ভার রাজস্বভুক্ত করলো। আবার শুরু হলো ইবলুম ধর্মচর্চা।


পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরপ্রধান ও সভাসদগণ বেছে বেছে রাজ্যের ঐ নগরগুলোকে টার্গেট করলো, যে নগরগুলোতে উর্বর জমি রয়েছে এবং জাতিতে যারা রাসা। আর পুরোহিতগণ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পরামর্শ দিতে লাগলো কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। পরিকল্পনা মোতাবেক একসময়ের শান্ত-নিবিড় নগরগুলো একে একে বিধ্বস্ত হতে লাগলো। নগরজুড়ে দেখা দিলো বিশৃঙ্খলা, চারদিকে বিদ্রোহ-অশান্তি। নগরের আয়ের অধিকাংশ অর্থ চলে গেলো যুদ্ধাস্ত্র কিনতে। এভাবে একসময় ঐ নগরগুলোতে দেখা দিলো দুর্ভিক্ষ আর সন্ত্রাসী কার্যক্রম। কেউ জানলো না এই অশান্তির পেছনে কারা ছিলো। সবাই যা দেখলো, তাহলো ঐ নগরে ধর্মীয়ভাবে উদ্বুদ্ধ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোই দায়ী এই অশান্তির পেছনে। আর নগরপ্রধান ও শাসকরা ব্যর্থ এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে। রাজ্যজুড়ে বাকি নগরগুলো বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের নিন্দা করতে লাগলো। কেউ কেউ বললো তাদের ধর্মগুলোই এরকম। এজন্যই এই অশান্তি। এরই মাঝে একসময়ের পিছিয়ে থাকা ভূসাম রাতারাতি উন্নতির শিকড়ে পৌঁছুতে লাগলো। তারা এবার যুদ্ধাস্ত্র ব্যবসা ও সৈন্যগঠনের ব্যাপারটা রাজ্যের সামনের প্রকাশ করলো। সবাই বুঝলো এই যুদ্ধাস্ত্র ও সেনাবাহিনীর প্রয়োজন এখন সময়ের দাবি। কারণ, বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ধীরে ধীরে বিভিন্ন নগরে ঢুকতে শুরু করেছে। হামলা করছে। নিরাপত্তার কথা ভেবে বাকি নগরগুলো ভূসামের কাছ থেকে অস্ত্র কিনে জমা করতে শুরু করলো।


শুধু নগর নয়, এখন পুরো রাজ্যজুড়ে যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সন্ত্রাসীদের দমন করতে বিভিন্ন নগরপ্রধানসহ রাজ্যপ্রধানও ভূসামকেই অনুরোধ করলো এই দায়িত্ব নিতে। আর এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলো ভূসামের নগরপ্রধান ও সভাসদ। তারা এভাবে উর্বর জমির নগরগুলো দখল করে নিলো। সেখানকার জমিগুলো চাষাবাদ করতে লাগলো নিজেদের প্রয়োজনে। আর জিইয়ে রাখলো বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের। সবসময় যুদ্ধ লেগেই থাকতো সে নগরগুলোতে। বিদ্রোহীদের সাথে নগর শাসকদের আর কখনোবা বিদ্রোহীদের সাথে ভূসামে সৈন্যের। এই জিইয়ে রাখা যুদ্ধের মাধ্যমে তারা রাজ্যের বাকি নগরগুলোকে বুঝাতো বিদ্রোহীরা কত শক্তিশালী। এ-সবই পুরোহিতদের পরিকল্পনা ছিলো। দিনকে দিন ভূসামের অর্থনীতি চাঙ্গা হতে লাগলো। ঘুঁচে গেলো তাদের খাদ্যকষ্ট। কারণ, তারা এখন অন্যনগরের জমিগুলো চাষাবাদের সুযোগ পেয়েছে।


ভূসাম আর ভূসাম নেই এখন। পার্থিব সকল সুখ যেন এখানে এসে ভিড়েছে। কিন্তু সমস্যাটা অন্যখানে। নগরের মানুষগুলো এখন আর ঈশ্বরের পূজা করে না। ইবলুম তাদের উন্নতি এনে দিয়েছে, মুক্তি দিয়েছে। তাই ঈশ্বরের চাইতে ইবলুম মন্দির ও পুরোহিতরাই হয়ে উঠলো ত্রাতা হিসেবে।


ভূসামের এই উন্নতির পেছনে ইবলুমের হাত রয়েছে এটা একসময় কয়েকটা নগরপ্রধানের কাছে প্রকাশ পেয়ে গেলো। তারাও ইবলুমের সাথে চুক্তি করতে এসেছে মন্দিরে। তিনশর্ত পূরণে পুরোহিত তাদেরও নিরাশ করেনি। এবার ইবলুম মন্দির স্থাপিত হবে অন্য কোনো নগরে।