মেসে ঢুকতেই কাউন্টারে বদরুলকে পেয়ে আমার রুমে ডেকে নিয়ে এলাম । দোতালায় আমি ছাড়া এখন আর কোন বোর্ডার নেই । রুমগুলো সব তালা দেয়া । বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজের অজান্তেই শরীরটা কেমন ছমছম করে উঠল।
ধীরে সুস্থে তালা খুলে ভেতরে ঢুকলাম । আমার পেছন পেছন বদরুল এসে ঢুকল । আমি খাটে বসে বদরুলকে চেয়ারে বসতে বললাম, ও বলল, বসতে হবে না রঞ্জু ভাই , কি বলবেন বলেন , হিসাবের খাতা নিয়ে বসেছি ।
তুমি কি স'দু ভাইকে দেখেছো ? আমি কোন রকম ভূমিকায় না গিয়ে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলাম ।
বদরুল কিছু বলল না । মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল । তারপর কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বলল,
সকালে বলি ভাই ?
এখন বললে কি সমস্যা?
রাতের বেলায় তেনাদের নিয়ে কোন কথা বলতে হয় না । বদরুল দেখে মনে হলো, ও গুটি চালতে শুরু করেছে ।
তেনারা মানে কারা ? আমি তোমাকে স'দু ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করছি । দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলাম ।
তেনারা মানে মৃত মানুষদের কথা বলছি । বদরুল ভয় পাবার অভিনয় করে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো । মেজাজটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে এই লোকটা ভণিতা ছাড়া কিছু বলতে পারে না ।
আমার প্রশ্নের উত্তর দাও , তুমি কি স'দু ভাইকে দেখেছো ?
জি ,দেখেছি ; বদরুল কিছুক্ষণ নীরব থেকে আমতা আমতা করে উত্তর দিল ।
কবে ?
ফাঁসি দেবার দু’দিন পরে । সন্ধ্যার সময় দোতালায় এসেছিলাম, হঠাৎ দেখি স'দু ভাইয়ের রুমের লাইট জ্বলছে । দরজা ভেতর থেকে বন্ধ । কে ভেতরে দেখার জন্য আমি দরজার ফাঁক দিয়ে উকি দিতেই দেখি স'দু ভাই টেবিলে বসে কি যেন লিখছে । আমার তো জান যায় যায় অবস্থা , তখন আমি এক দৌড়ে নিচে গিয়ে বাবুর্চি তোতারে ডেকে এনে দেখি কেউ নাই । ভেতরের বাতিও নেবানো।
তুমি মিথ্যা বলছ না তো ?
আল্লাহর কসম ভাই, মিথ্যা বোলুম ক্যান ? বদরুল কসম কেটে মাথায় হাত রেখে বলল ।
তোমার কাছে স'দু ভাইয়ের রুমের চাবি আছে তাই না ? আমি সরাসরি বদরুলের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম । বদরুল সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে ফেলল । মানুষ কখনো সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যা বলতে পারে না । বিবেক বাঁধা দেয় । বদরুলের কথা আমার এমনিতেই বিশ্বাস হয় না ।
না, বদরুল মাটির দিকে তাকিয় বলল ।
এবার কিন্তু মিথ্যা বলছ । আমার সঙ্গে ওসির সাহেবের কথা হয়েছে কোন রকম উল্টা পাল্টা দেখলেই সরাসরি ফোন করতে বলেছেন । তুমি কি চাও আমি তোমার কথাটা ওসি সাহেব'কে বলি । ওসি সাহেবের কথাটা আমি বানিয়ে বললাম । আমার সন্দেহ হচ্ছে বদরুল এমন কিছু জানে যা আমাকে বলতে চাচ্ছে না ।
ওসির কথা শুনে, বদরুল হঠাৎ খুব ঘাবড়ে গেল ।
কাঁচুমাচু হয়ে বলল, রঞ্জু ভাই আমি কিন্তু কিছু করি নাই ।
তুমি কিছু করেছো সেটা তো আমি বলিনি । শুধু এইটুকু বলেছি আমার সঙ্গে মিথ্যা বললে ফেঁসে যাবে । তোমার কাছে স'দু ভাইয়ের রুমের চাবি আছে তাই না ?
বদরুল মাথা নাড়ল, আছে ।
তুমি স'দু ভাইয়ের রুমে ঢুকেছিলে তাই না ?
বদরুল 'না' বলতে গিয়েও কি মনে করে থেমে গেলো ।
দেখো, মিথ্যা বলো না, একদম ফেঁসে যাবে ।
পুরো ঘটনাটা আমাকে খুলে বলো ।
কোন ঘটনা ?
তুমি স'দু ভাইয়ের রুমে কেন ঢুকেছিলো? কোন জিনিষপত্র কি সরিয়েছ ?
আল্লাহর কিরা রঞ্জু ভাই আমি কিছু সড়াইনি ।
তারমানে তুমি স'দু ভাইয়ের রুমে ঢুকছিলে ?
জ্বি ?
কেন ঢুকেছিলে?
ঝাড়পোছ করতে ।
ঝাড়পোছ করেছো ?
না, ।
না কেন ?
ভয়ে চলে এসেছি ?
ভয় ? কিসের ভয়ে ?
স'দু ভাইয়ের ।
স'দু ভাইয়ের মানে ?
আমি সকাল বেলা স'দু ভাইয়ের রুমে ঢুকে জানালাগুলো খুলছিলাম হঠাৎ পেছন থেকে স'দু ভাইয়ের গলা শুনে চমকে পেছন ফিরে দেখি স'দু ভাই টেবিলের উপড়ে বসে আছে । আমি তাকাতেই আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, বদরুল জানালা খুলিস না রে রোদ আসে । আলো সহ্য হয় না ।

এরপর আমি দৌড়ে রুম থেকে ওই রুম থেকে বের হয়ে আসি । পরে তোতার ডেকে এনে দরজা বন্ধ করেছি । বিশ্বাস করেন রঞ্জু ভাই এর মধ্যে এক বিন্দু মিথ্যা নাই ।
চাবিটা তোমার সঙ্গে আছে ?
জি , বলে বদরুল এক গোছা চাবি বের করে তার মধ্যে থেকে পিতলের একটা চাবি দেখালো।
চাবিটা আমাকে দাও ।
বদরুল চাবির গোছা থেকে চাবিটা খুলে দিতে দিতে বলল, রঞ্জু ভাই একটু সাবধানে থাকবেন । দোতালায় কিন্তু এখন আপনি ছাড়া আর কেউ নেই ।
ঠিক আছে , তুমি এখন যাও ।
খাবেন না ? খাবার দেবো ?
না, খাবো না । তুমি পারলে এক ফ্লাক্স চা পাঠাও । রাতে লেখালেখি করতে হবে ।
কোন কিছুর দরকার হলে আমারে আওয়াজ দিয়েন । আমি জেগে থাকবো ।
ঠিক আছে,দরকার হলো ডাকবো । তুমি এখন যাও ।
বদরুল দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে ডাক দিল , রঞ্জু ভাই ?
বলো ?
আজ আপনার খোঁজে একটা মেয়ে এসেছিলো ।
মেয়ে ? আমি অবাক হয়ে তাকালাম বদরুলের মুখের দিকে । কেননা ঢাকা শহরে আমার পরিচিত এমন কোন মেয়ে নেই যে আমার সাথে দেখা করতে মেস পর্যন্ত আসবে । তারপর জিজ্ঞাসা করলাম , কখন ।
দুপুরের দিকে ?
কিছু বলেছে ?
আপনি নেই , শুনে জিজ্ঞাসা করলো কখন আসবেন । জানিনা বলায় । কখন আসলে আপনাকে পাওয়া যাবে জিজ্ঞাসা করলো , আমি বলেছি , সকালে । এরপর ঠিক আছে বলে চলে গেছেন ।
ঠিক আছে তুমি যাও ।
বদরুল চলে যেতে জামাকাপড় পাল্টে চা খেয়ে লিখতে বসলাম । একটানা অনেকক্ষণ লেখার পর হঠাৎ লেখার খেই হারিয়ে ফেললাম । কিছুতেই লিখতে পারছি না । বারবার চিন্তায় ছেদ পরছে । একজন লেখকের জন্য এটা বুঝি সবচাইতে বেশি কষ্টের বিষয় ।

হঠাৎ খুব গরম অনুভব করছি । দু ঢোক পানি খেয়ে টেবিলের পাশের জানলাটা খুলে দিয়ে আবারও লিখতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম ।আরো কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর বুঝলাম আজ আর কিছু হবে না । দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি , সাড়ে তিনটা বাজে । লেখা বন্ধ করে যতোটুকু লেখা হয়েছে তা নিয়ে বিছানায় শুয়ে তা পড়তে লাগলাম । পড়তে পড়তে ঘুমে চোখের পাতা লেগে এসেছিলো হঠাৎ বাইরে দুপ করে কিছু একটা পরার শব্দ হলো । সঙ্গে সঙ্গে আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠলো । দ্বিতীয় বার শব্দটা শোনার জন্য কান খাড়া করে রাখলাম । ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দ ছাড়া অন্য কোন শব্দ নেই । আবারও হলো শব্দটা । এবার বেশ স্পষ্ট ভাবেই শোনা গেল। বারান্দার ডান পাশ থেকে আসছে শব্দটা অর্থাৎ স'দু ভাইয়ের রুমের দিক থেকে ।

হঠাৎ টের পেলাম কোন কারণ ছাড়াই মাথার চুলগুলো একটা একটা করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে । শোয়া থেকে উঠে বসলাম । আমার কাছে মনে হলো কেউ খুব সন্তর্পণে দরজা খুলে বাহীরে আসলো। কিন্তু কোন রুমের দরজা খুললো সেটা বুঝতে পারলাম না । এবার বারান্দায় পায়ের শব্দ শোনা গেলো । কেউ খুব ধীরে ধীরে হাঁটছে । আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে চলেছে । কান খাড়া করে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম । অশুভ ভাবনায় পেয়ে বসলো । মনে হলো দরজা খুললেই ভয়াবহ কিছু একটা দেখবো । পায়ের শব্দটা আমার দরজা হয়ে সিঁড়ির দিক থেকে ঘুরে আবার স'দু ভাইয়ের ঘরের দিকে যাচ্ছে । পায়ের শব্দটা আমার দরজার কাছাকাছি আসতেই, আমি একটানে দরজাটা খুলে ফেললাম । পুরো বারান্দা অন্ধকার । কোন আলো নেই । অন্ধকারে কাউকে দেখতে পেলাম না । অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসতে দেখলাম শূন্য বারান্দা খাঁ খাঁ করছে । আমি কিছুটা ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম ।


কাউকে না দেখে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম । বুকের ভেতর কম্পন বেড়ে গেছে । টেবিলের উপর রাখা বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খেলাম । বিছানায় বসতেই দরজায় পরপর তিনটা টোকার শব্দ হলো । সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠে দরজার দিকে তাকালাম । বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেছি । ভয়ে ঘামতে শুরু করেছি । মাথার চুলগুলো আবারও একটা একটা করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ।

তবুও কোন রকম জিজ্ঞাসা করলাম কে ? কে ? গলাটা যেনো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে । দিয়ে কোন শব্দ বের হতে চাচ্ছে না । অথচ এই মাত্র পানি খেলাম ।
কেউ উত্তর দিল না । আমি দরজার কাছে গিয়ে কান পেতে দাঁড়িয়ে রইলাম ।
না, আর কোন শব্দ নেই । হয়তো মনের ভুল , অতিরিক্ত উত্তেজনায় এলোমেলো শুনছি ।

বেশ কিছুক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকার পর আবারও বিছানায় এসে বসলাম । নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি ভয় পাবার কিছু নেই । সব মনের ভুল হবে । মৃত মানুষ কখনও ফিরে আসতে পারে না । বিছানায় শুয়ে আবারও যেই না লেখাটা পড়তে শুরু করেছি । ওমনি আবার দরজায় ঠুক ঠুক ঠুক করে শব্দ হলো।

সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলাম দরজার কাছে তারপর একটানে খুলে ফেললাম দরজা । তারপর যা দেখলাম তাতে আমার পুরো শরীর কেপে উঠল । আমি হিস্টিরিয়ার রুগীর মতো চিৎকার করে উঠলাম কে ? কে ?

দরজায় যে দাঁড়িয়ে আছে সে আর কেউ না । স্বয়ং স'দু ভাই । নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস হলো না । মা গো বলে অস্ফুট একটা শব্দ করে পিছিয়ে এলাম । স'দু ভাই দরজায় এসে দাঁড়ালেন । আধো আলো আধো অন্ধকারে স'দু ভাইকে চিনতে অসুবিধা হলো না । মুখটা শুকিয়ে পাংশু হয়ে গেছে । চোখ দুটো গর্তের ভেতরে ঢুকে আছে । শরীরের চামড়া লকলক করছে । আমি বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইলাম ।

স'দু ভাই বললেন, রাইটার সাব, একটা কাঁথা দিবা ? আমার খুব শীত করছে । এইখানে,এখানে খুব খুব শীত । দাওনা একটা কাঁথা । আমি দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলাম ।
প্রচণ্ড ভয়ে পিপাসায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। মনে হলো আমি মরে যাচ্ছি । কানের ভেতরে ভো ভো শব্দ শুনতে পাচ্ছি । কিছু দেখছি বলে মনে হলো না । মনে হলো সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসছে । হঠাৎ ওমর ফারুক সাহেবর কথা মনে হলো, বুঝতে পারলাম, ভদ্রলোক কেন ভয় পেয়েছেন । আমি বড় করে হা করে শ্বাস নিয়ে ছাড়তে লাগলাম । বাকি রাতটুকু দরজায় হেলান দিয়ে কাটিয়ে দিলাম ।

চলবে ......