তিন
মধুমিতা মেসের সামনে ছোট খাটো একটা ভীড় জমে আছে। আশে পাশের দশ বাড়ি থেকে কিছু অতি উৎসাহী লোকজন মেসের দিকে উঁকিঝুঁকি মারছে।
মূল রাস্তায় দু’টো পুলিশের গাড়ী দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম ।
অনেকক্ষণ হাঁটার ফলে প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করছি । মনে হচ্ছে গোসল করতে পারলে ভাল লাগতো । সারাদিন প্রচন্ড দখল গেছে শরীরের উপর দিয়ে । কিন্তু এতো রাতে মেসের সামনে এতো লোকজন কেন জড়ো হয়েছে সেটা বুঝতে পারলাম না । পুলিশের ভ্যানই বা কেন এসেছে । কোন অঘটন ঘটে নিতো ! আমার কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো।
কৌতূহল নিয়ে মেসের ভেতরে ঢুকার জন্য পা বাড়াতেই গেটের কাছে পুলিশের একজন এসআই পথ রোধ করে দাঁড়াল । আমাকে আপাতমস্তক এক নজর দেখে নিয়ে খেঁকিয়ে উঠলো , “ত্র্যাই, এইখানে কি ?”
মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো । লোকটার দিকে তাকিয়ে আমিও পাল্টা খেঁকিয়ে উঠলাম, এখানে কি মানে কি? মানুষ হচ্ছে শক্তের ভক্ত নরমের যম । পাল্টা খেকিয়ে উঠায় কাজ হলো ।
এবার এসআই একটু নরম স্বরে বলল,এতোরাতে এখানে কি চাই?
আমি বললাম,আমি এখানে থাকি।ভেতরে যাবো।
এখানে থাকেন?
আমি বেশ ধীঢ়তার সাথে বললাম, জ্বি, এখানেই থাকি,
কি নাম আপনার ?
ছোট্র করে বললাম, রন্জু ।
তা,এতরাতে কোথা থেকে এলেন মিস্টার রঞ্জু সাহেব ?
কাজ ছিলো তাই ফিরতে দেরি হয়ে গেছে।
কি কাজ ?
এফডিসিতে একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম ।
এফডিসি! এফডিসির কথা শুনে লোকটা আমার দিকে কৌতুহল নিয়ে তাকালো । তারপর নরম সুরে বলল,কি করেন আপনি, মানে আপনার প্রফেশন কি?
লেখালেখি করি। গল্প, উপন্যাস , চিত্রনাট্য লিখি ।
- ও বই লিখেন ?লোকটা কি বুঝে কি প্রশ্ন করল বুঝলাম না ।
পুলিশ আর পাগলের সাথে তর্কে যেতে নেই । যা ইচ্ছে বুঝুক, যা ইচ্ছে করুক আমার কি। মনে মনে হাসলাম এই ভেবে যে,আজ পাগল ও পুলিশ দু'জনের সাথেই দেখা হয়ে গেলো। ঝামেলা আর বাড়াতে না চেয়ে মাথা নেড়ে আমি তার প্রশ্নের উত্তরে বললাম, হ্যাঁ, বই লিখি।
কতোদিন ধরে থাকেন এখানে ? এসআই তার হাতের লাঠিটা উচিয়ে মেসটা দেখিয়ে প্রশ্ন করলো।
আমি বললাম, বছর তিনেক হবে।
- স'দু সাহেব'কে চিনেন ?
আমি কপাল কুচকে বললাম, চিনবো না কেন ? তিনি এই মেসের মালিক । খুব ভাল করেই চিনি।
- আছ্ছা বলুন তো, উনি ক্যামন মানুষ ছিলেন, মানে, কারো সাথে কোন রকম ঝুট ঝামেলার কথা কি শুনেছেন কখনো ?
আমি মাথা নেড়ে না করে বললাম , উনি স্থানিয় মানুষ । যতোদূর দেখেছি ছোট, বড় সবার সাথেই ওনার খুব ভাল সর্ম্পক । কারো সাথে কোন ঝুট ঝামেলা আছে বলে জানি না ।
স'দু ভাইয়ের নাম শুনে ভেতরটা ক্যামন যেনো করে উঠলো । বুঝলাম না, পুলিশ স'দু ভাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করছে কেন ?
কাউন্টারের কাছে ম্যানেজার বদরুলকে দেখলাম দাঁড়িয়ে ফুপিয়ে, ফুপিয়ে কাঁদছে । কাদছে না বলে বলা যায়, কান্নার ভান করছে । এতো বড় একজন মানুষের কান্নার অভিনয় দেখতে ভাল লাগেনা । তার উপরে বদরুলকে তো আরো না ।
প্রচন্ড রকমের বদ এই বদরুল। মেস বোর্ডারদের কারো সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে না । সুযোগ পেলেই পানি,বিদ্যূত বন্ধ করে দেয় । স'দু ভাইয়ের কাছে বোর্ডারদের নামে বানিয়ে বানিয়ে বিচার দেয়া তো ওর নিত্য নেমিন্তিক ব্যাপার । সবার সাথে গায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া করে । তার উপর, প্রতি দিনের মিল থেকেও নাকি টাকা চুরি করে ।
আমাকে দেখে বদরুল, রন্জু ভাই গো, বলে ছুটে এসে জরিয়ে ধরল ।
বদরুল লোকটাকে আমার বিশেষ পছন্দ না । আমি পারত পক্ষে ওর সঙ্গে কথা বলি না । স'দু ভাই আমাকে বিশেষ খাতির করেন বলে বদরুলও আমাকে এড়িয়ে চলে । কখনো লাগতে আসে না ।
সেই বদরুলের নাটকিয় ভাবে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরায় আমি অবাক না হয়ে পারলাম না ।
মানুষের আবেগকে কখনো উপেক্ষা করতে হয় না । হোক না সে যতোই মন্দ মানুষ । কিন্তু বদরুলের ব্যাপারটা ভিন্ন ।
আমি বদরুলকে ছাড়িয়ে দিতে দিতে নরম অথচ শক্তভাবে প্রশ্ন করলাম; “কি হয়েছে বদরুল ? ”
বদরুল তার নাটকটা জমাতে চেষ্টার কমতি করলো না, সুর করে, সদু ভাই,বলে আবারও কাঁদতে লাগল । আমি পরিস্কার বুঝলাম ব্যাটা অভিনয় করছে ।
নিজেকে সংযত করে দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞাসা করলাম, সদু ভাই কি ?
বদরুল কিন্তু অভিনয় ছাড়লো না, আগের মতো ই কাদতে কাদতে বললো, সদু ভাই, সদু ভাই আর নেই।
নেই মানে ? কোথায় গেছেন ? ভণিতা না করে আসল কথা বলো ।
আমি অস্থির হয়ে উঠলাম ।
সদু ভাই, সদু ভাই আত্মহত্যা করেছেন । বলে বদরুল ছেলে মানুষের মতো কাঁদতে লাগলো। এবার আর ওর কান্নাটাকে অভিনয় বলে মনে হলো না ।
আমি প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলাম, “এই কি বলছিস তুই ? সদু ভাই কেন আত্মহত্যা করতে যাবে ?"
জানি না কেন ? ভালা মানুষ, রাতে সবার সাথে ডাইনিং এ বসে খাওয়া দাওয়া করার পর নিজের রুমে গিয়ে আমারে ডেকে বললো, তুই রাইটার সাবের রুমে খাবারটা দিছে কি না খোঁজ নে । আমি একটু বিশ্রাম নেই ।
আপনার রুমে খাবার দিছে কিনা সেই খবরটা রেহানার মাকে জিজ্ঞাসা করে আইসা দেখি স'দু ভাইয়ের দরজার ভেতর থেকে বন্ধ । অনেক ডাকাডাকি করার পরেও উনি দরজা খুললো না । ঘুমায় পরছে মনে কইরা আমি নিজের রুমে চইলা গেলাম ।
পরে বুয়া আইসা ডাইকা নিয়া বললো সদু ভাই নাকি ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে । দৌড়ে গিয়া দেখি সত্যিই ভাইয়ে ফ্যানের লগে ঝুলতাছে । বলেই বদরুল ভ্যা ভ্যা করে কাদতে লাগলো ।
স'দু ভাইয়ের মৃত্যুর বর্ণনা শুনে আমি যারপর নাই চমকে উঠলাম , বলে এরা । স'দু ভাই কোন দু:খে আত্মহত্যা করতে যাবে ।
বদরুলের দিকে তাকিয়ে বললাম, সদু ভাই এখন কোথায় ?
বদরুল চোখের পানি মুছতে মুছতে দোতালায় যাবার সিঁড়িটা দেখিয়ে দিলো ।
দোতালার শেষ মাথায় সদু ভাইয়ের একটা রুম আছে । স'দু ভাই সেটাকে অফিস রুম হিসাবে ব্যবহার করেন । চেয়ার টিবিলের পাশে সিঙ্গেল একটা খাট বিছানো আছে । মাঝে মাঝে রাতে থেকে গেলে সেটাতে স'দু ভাই ঘুমান।
আমি এসআই'য়ের দিকে উপড়ে যাবার জন্য অনুমতি পাবার দৃষ্টিতে তাকালাম । এসআই আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, যান। তবে কোন কিছু স্পর্শ করবেন না । এটা মার্ডার কেসও হতে পারে।
ঠিক আছে, বলে আমি দৌড়ে দোতালায় উঠে এলাম। দোতালার বারান্দায় চেনা, অচেনা অনেক মানুষ । তাদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ ও রয়েছে । আমার রুমটা দোতালার মাঝামাঝি । আমার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম দরজায় তালা ঝুলছে। বারান্দায় যারা দাড়িয়ে ছিলো তাদের মধ্যে যারা আমাকে চেনে তারা সরে গিয়ে শেষ মাথায় সদু ভাইয়ের রুমের দিকে যাবার জন্য রাস্তা করে দিল ।
সদু ভাইয়ের রুমে ঢুকে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম । সত্যি সত্যি স'দু ভাইয়ের বিশাল দেহটা ফ্যানের সঙ্গে বিশ্রী ভাবে ঝুলছে । জ্বিহবা মুখ থেকে বের হয়ে আছে । চোখ দু’টো খোলা । বিশাল দু'টো হাত দুপাশে ছড়ান । পুরো শরীরে কোন কাপড় নেই । পা দু'টো মেঝের সাথে লাগানো । এমন দৃশ্য কল্পনাও ছিলো না । কয়েক মূর্হুতের জন্য আমার মাথা ঘুড়ে উঠলো । মনে হলো আশে পাশের সব কিছু ভনভন করে ঘুরছে । কোন রকম নিজেকে সামলে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম।
কিছুতেই বুঝে এলো না , স'দু ভাই কেন আত্মহত্যা করতে যাবে । সকালেও তো কতো আদর করে বিদায় দিলেন । আমার চোখ দিয়ে অঝর ধারায় পানি নেমে এলো ।
থানা থেকে ওসি সাহেব আসার পর সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে পোস্টমর্টেমের জন্য লাশ নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো । পুলিশ মেসের বর্ডারদের থানাতে না জানিয়ে দূরে কোথাও না যাবার নির্দেশ দিয়ে চলে গেল ।
ঘড়িতে তখন সাড়ে তিনটা বাজে। ইতিমধ্যে আমি একটু ধাতস্থ হতে পেরেছি । সদু ভাই নেই । কথাটা ভাবতেই বুকের ভেতরটা ক্যামন করে উঠছে। বারবার সদু ভাইয়েই মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে ।
রুমে ঢুকে দেখি টেবিলের উপর আমার রাতের খাবার ঢেকে রাখা অবস্থায় রয়েছে। ভদ্রলোক সব সময় আমার খেয়াল রাখতো । আহা! বলে বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো । আমি হঠাৎ কান্নায় ভেঙ্গে পরলাম । বুক চেপে ধরে খাটের উপর বসে পরলাম।
হঠাৎ এফডিসির বাইরে দেখা লোকটার কথাটা কানে ভাসতে লাগল, তোর তো আপন কেউ নেই , তাই হারাবার ও কিছু নেই । তুই তাহলে রাজি ? তুই তাহলে রাজি ? এখন আমার কাছে মনে হতে লাগলো সদু ভাই আমার আত্মীয় না হয়েও আত্মীয়ের চেয়ে অনেক বেশি আপন ছিলেন ।


